Warning: Cannot modify header information - headers already sent by (output started at /home/professo/public_html/akik/information.php:7) in /home/professo/public_html/akik/head.php on line 16
Professor's >> Akik Publication

 
 

 
 
 
804931
জন সাইটটি দেখেছেন
ইসলামিক নলেজ

ইসলাম

ইসলাম আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ করা, শান্তির পথে চলা। আল্লাহর প্রতি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁর পূর্ণ আনুগত্য ও তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করা, বিনা দ্বিধায় আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলা এবং তাঁর দেয়া বিধান অনুসারে জীবনযাপন করাকে ইসলাম বলে। যিনি ইসলামের বিধান অনুযায়ী জীবনযাপন করেন, তিনি মুসলিম।

ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দীন, যা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত এ জীবনব্যবস্থার আলোকেই একজন মুসলমান জীবনযাপন করে থাকেন। ইসলামে রয়েছে সুষ্ঠু সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থব্যবস্থা। রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা। মানব চরিত্রের উকর্ষ সাধনের যাবতীয় আচার-আচরণ সম্পর্কে ইসলাম সুন্দর দিক নির্দেশনা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ইসলামই আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দীন।’ (সূরা আলে ইমরান ৩ : ১৯)
পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন গ্রহণ করতে চাইলে কস্মিনকালেও তা কবুল করা হবে না।’ (সূরা আলে ইমরান ৩ : ৮৫)

রাসূল (স) ইসলামের সংজ্ঞায় বলেন, ‘ইসলাম হলো আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (স) আল্লাহর রাসূল এ কথা বলে সাক্ষ্য দেয়া, নামায আদায় করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের রোযা পালন করা এবং যাতায়াতের সামর্থ্য থাকলে বাইতুল্লাহর হজ্ব আদায় করা।’ (বুখারী ও মুসলিম)

ইসলামী বিধানের প্রধান উস দু’টি। প্রথম উস পবিত্র কুরআন এবং দ্বিতীয় উস হযরত মুহাম্মদ (স)-এর বাণী, কাজকর্ম ও আচার-আচরণ। সেই সাথে ইসলামের রুকন বা স্তম্ভ পাঁচটি। যথা-

১. ঈমান;
২. নামায;
৩. রোযা;
৪. যাকাত এবং
৫. হজ্ব।

ঈমান ও আকাইদ

‘ঈমান’ শব্দের শাব্দিক অর্থ বিশ্বাস করা, স্বীকার করা, ভরসা করা, নিরাপত্তা প্রদান করা ইত্যাদি। ইসলামী পরিভাষায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যে সব গায়েব (অদৃশ্য)-এর খবর নিয়ে এসেছেন সে সকল বিষয়কে অন্তরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করাকে ঈমান বলে।

আল্লাহ এক, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, আসমানী কিতাব, ফেরেশতা, আখিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদি ঈমান সংশ্লিষ্ট বিস্তারিত বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস বা প্রত্যয়ের নাম আকীদা। আকীদা শব্দের বহুবচন আকাইদ। একজন প্রকৃত মুসলিম তিনি, যিনি অন্তরে যে আকীদা পোষণ করেন, ভাষায় তা প্রকাশ করেন এবং কর্মে তার প্রতিফলন ঘটান।

ঈমান ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের প্রথম ও প্রধান স্তম্ভ। ঈমানের অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। এর সাতটি শাখা বা ভাগ রয়েছে। এগুলো হলো:
১.  ‘আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই এবং হযরত মুহাম্মদ (স) তাঁর বান্দা ও রাসূল’-এ কথায় বিশ্বাস রাখা;
২.  ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস রাখা;
৩.  সমস্ত ঐশী গ্রন্থের ওপর বিশ্বাস রাখা;
৪.  সকল নবী ও রাসূলের নবুওয়াতের প্রতি বিশ্বাস রাখা;
৫.  পরকালে বিশ্বাস রাখা;
৬.  তকদীর বা ভাগ্যে বিশ্বাস রাখা;
৭.  মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ও শেষ বিচারে বিশ্বাস রাখা।

এই সাতটি বিষয়ের ওপর দৃঢ় আস্থা স্থাপন একজন মুমিনের জন্য ফরয বা অবশ্য কর্তব্য।

নামায বা সালাত

আরবী ‘সালাত’ শব্দের প্রতিশব্দ হলো নামায। সালাত এর আভিধানিক অর্থ দোয়া, রহমত, ইসতিগফার ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিশেষ কিছু আমলের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করার নাম নামায।
ইসলামে নামাযের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে এটি অন্যতম। ঈমান ছাড়া অন্য চারটি রুকনের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বজনীন। নামাযকে দীনের খুঁটি বলা হয়। খুঁটি ছাড়া যেমন ঘর কল্পনা করা যায় না, তেমনি নামায ছাড়া দীন পরিপূর্ণ হয় না। প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ সকলের ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা ফরয।

নামায সম্পর্কিয় কুরআনের কতিপয় আয়াতের মর্মার্থ :
১.  ‘তোমরা নামায কায়েম কর ও যাকাত দাও এবং যারা রুকু করে তাদের সাথে রুকু কর।’ (সূরা বাকারা ২ : ৪৩)
২.  ‘নিশ্চয় নির্ধারিত সময়ে নামায কায়েম করা মু’মিনদের জন্য অবশ্য কর্তব্য।’ (সূরা নিসা ৪ : ১০৩)
৩.  ‘নামাযসমূহের প্রতি তোমরা যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের ব্যাপারে। এবং তোমরা নামাযের জন্য অনুগত হয়ে দাঁড়াও।’ (সূরা বাকারা ২ : ২৩৮)
৪.  ‘আর দিনের দুইপ্রান্তে নামায ঠিক রাখবে, আর রাতেরও প্রান্ত ভাগে।’ (সূরা হুদ ১১ : ১১৪)
৫.  ‘সূর্য ঢলে যাওয়ার সময় থেকে রাত্রির অন্ধকার পর্যন্ত নামায কায়েম করুন। আর ফজরের সময় কুরআন পাঠ করুন।’ (সূরা বনি ইসরাইল ১৭ : ৭৮)

নামাযের ফরযসমূহ :
নামাযের ফরয ১৩টি। তন্মধ্যে নামাযের পূর্বের ৭টিকে নামাযের আহকাম বা শর্ত বলে এবং ভিতরের ৬টিকে নামাযের আরকান বলে। যথা:

নামাযের পূর্বের ৭টি :
১.  শরীর পাক। [‘আর তোমরা অপবিত্র হলে পাক-সাফ হয়ে যাও।’ (সূরা মায়িদা ৫ : ৬)]
২.  পোশাক পাক। [‘আর তোমার পোশাক পবিত্র কর।’ (সূরা মুদ্দাসসির ৭৪ : ৪)]
৩.  নামাযের জায়গা পাক। [‘যে স্থানে দাঁড়িয়ে নামায পড়বে সে জায়গা পাক পবিত্র হতে হবে।’ (মুসলিম শরীফ)]
৪.  সতর ঢাকা। [‘হে বনী আদম, প্রত্যেক নামাযের সময় তোমরা সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান কর।’ (সূরা আরাফ ৭ : ৩১)]
৫.  নামাযের ওয়াক্ত হওয়া। [‘নির্ধারিত সময়ে নামায কায়েম করা মু’মিনের জন্য আবশ্যক।’ (সূরা নিসা ৪ : ১০৩)]
৬.  কিবলামুখী হওয়া। [‘তোমরা (নামাযের সময়) কাবার দিকে মুখ কর।’ (সূরা বাকারা ২ : ১৫০)]
৭.  নিয়ত করা। [‘আমলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়তের উপর নির্ভরশীল।’ (বুখারীর প্রথম হাদীস)]

নামাযের ভিতরের ৬টি :
১.  তাকবীরে তাহরীমা বলে নামায শুরু করা। [‘তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।’ (সূরা মুদ্দাসসির, ৭৪ : ০৩)]
২.  দাঁড়িয়ে নামায পড়া। [‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনীতভাবে দাঁড়াবে।’ (সূরা বাকারা ২ : ২৩৮)]
৩.  কিরাআত পড়া। [‘তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ হয়, ততটুকু পড়।’ (সূরা মুযযাম্মিল ৭৩ : ২০)]
৪.   রুকু করা। [‘তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।’ (সূরা বাকারা ২ : ৪৩)]
৫.   সিজদা করা। [‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা রুকু কর এবং সিজদা কর।’ (সূরা হজ ২২ : ৭৭)]
৬.   শেষ বৈঠক করা, অর্থা সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করা।
উল্লেখ্য, নামাযের কোনো ফরয বাদ গেলে নামায বাতিল হয়ে যায় সাহু সিজদা করলেও নামায সহীহ হয় না। (বাহরুর বায়িক–১৫০৫, শামী–১-৪৪৭, হিদায়া–১-৯৮)

নামাযের ওয়াজিবসমূহ:
ওয়াজিব মানে অবশ্য করণীয়। ফরযের পরই ওয়াজিবের স্থান।
১.  প্রত্যেক রাকাআতে সূরা ফাতিহা পড়া। (বুখারী শরীফ-হা.নং ৭৫৬)
২.  সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা বা ছোট তিন আয়াত পরিমাণ মিলানো। (বুখারী শরীফ-হা. নং ৭৭৬)
৩.  সূরা ফাতিহাকে অন্য সূরার পূর্বে পড়া। (তীরমিযী শরীফ-হা নং-২৪৬)
৪.  ফরয নামাযের প্রথম দু রাকাতকে কিরাতের জন্যে নির্দিষ্ট করা। (বুখারী শরীফ-হা. নং ৭৭৬)
৫.  নামাযের সকল রোকন ধীরস্থীরভাবে আদায় করা। অর্থা, রুকু, সিজদা এবং রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এবং দুই সিজদার মাঝখানে সোজা হয়ে বসে কমপক্ষে এক তাসবীহ পরিমাণ দেরি করা। (আবু দাউদ শরীফ-হা. নং ৮৫৬, ৮৫৭, ৮৫৮)
৬.  প্রথম বৈঠক করা। (বুখারী শরীফ-হা. নং ৮২৮)
৭.   উভয় (প্রথম ও শেষ) বৈঠকে তাশাহহুদ পড়া। (বুখারী শরীফ-হা. নং ৮৩০, ৮৩১)
৮.  নামাযের ফরয ও ওয়াজিবগুলোকে ধারাবাহিক বা সিরিয়াল অনুযায়ী আদায় করা। (তিরমীযী শরীফ-হা. নং ৩০২, বাদায়ে সানায়ে-১-৬৮৯)
৯.  বিতিরের নামাযের তৃতীয় রাকাতের কিরাতের পর দুআ কুনুত পড়া। অবশ্য দুআ কুনুত না পারলে অন্য কোনো দুআ যেমন-‘আল্লাহুম্মাগ ফিরলী’ তিনবার বা ‘ইয়া রাব্বি’ তিনবার পড়বে। (আহকামে যিন্দিগি-২০৭)
১০. দুই ঈদের নামাযে অতিরিক্ত ছয় তাকবীর বলা। (আবু দাউদ হা. নং ১১৫৩)
১১. দুই ঈদের নামাযে দ্বিতীয় রাকাআতের রুকুর তাকবীর বলা। (মুছান্নফে ইবনে আবি শাইবাহ, হা. নং ৫৭০৪)(তবে এ তাকবীরটি অন্যান্য নামাযে সুন্নত)
১২. ইমামের জন্যে যোহর আসর এবং দিনের বেলায় সুন্নত ও নফল নামাযে কিরআত আস্তে পড়া এবং ফযর, মাগরিব, ঈশা, জুমুআ, দুই ঈদ, তারাবীহ ও রমযান মাসের বিতর নামাযে কিরআত শব্দ করে পড়া। (মুসান্না ফে ইবনে আবি শাইবাহ, হা. নং ৫৪৫২)
১৩. সালামের মাধ্যমে নামায শেষ করা (আবু দাউদ হা. নং ৯৯৬)
বি:দ্র: উল্লিখিত ওয়াজিবসমূহের কোনো একটি ভুলে ছুটে গেলে সাহু সিজদা ওয়াজিব হবে। সাহু সিজদা না করলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ওয়াজিব ছেড়ে দিলে নামায ফাসিদ হয়ে যাবে। তখন পুনরায় পড়া ওয়াজিব। (ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী-১-৭১)

নামায প্রসঙ্গে কিছু হাদীস (অনুবাদ):
১।  রাসূল (স) বলেন, ‘তোমরা ঐভাবে সালাত আদায় কর যেভাবে আমাকে আদায় করতে দেখ।’ (বুখারী)
২।  রাসূল (স) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করে তখন বসার পূর্বে যেন অবশ্যই দু’রাকাআত সালাত আদায় করে নেয়।’ (বুখারী)। এই সালাতকে তাহইয়াতুল মসজিদ বলে।
৩।  রাসূল (স) বলেন, ‘যখন ইক্কামত হয়ে যায় তখন ফরজ সালাত ছাড়া অন্য সালাত নেই।’ (মুসলিম)
৪।  রাসূল (স) বলেন, ‘সালাতে আমাকে হুকুম করা হয়েছে পোশাক না গুটাতে।’ (মুসলিম) (অর্থাৎ জামার হাতা বা ঝুল না গুটানো)।
৫।  রাসূল (স) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের কাতার সোজা কর, একের পা অপরের সাথে মিলিয়ে দাঁড়াও কারণ আমি তোমাদেরকে আমার পেছন দিক থেকে দেখতে পাই। অন্য রেওয়ায়েত আছে (ছাহাবীরা বলেন:) আমরা আমাদের প্রত্যেকে একে অপরের কাধের সাথে কাধ এবং পায়ের সাথে পা মিলিয়ে দাঁড়াতাম।’ (বুখারী)
৬।  রাসূল (স) বলেন, ‘যখন ইক্বামত হয়ে যায় তখন তোমরা তাড়াহুড়া করে উপস্থিত হয়ো না। বরং স্বাভাবিক ও ধীর স্থীরভাবে হেটে এস। ইমামের সাথে যা পাও তা আদায় কর, আর যা ছুটে গেছে তা পূর্ণ কর।’ (বুখারী ও মুসলিম)
৭।  রাসূল (স) বলেন, ‘এমনভাবে রুকু কর যাতে এতমিনান আসে, তারপর রুকু হতে পরিপূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়াও। এরপর সিজদা কর এতমিনানের সাথে।’ (বুখারী)
৮।  রাসূল (স) বলেন, ‘আমি তোমাদের ইমাম, তাই রুকু ও সিজদাতে আমার আগে আগে যাবে না।’ (মুসলিম)
৯।  রাসূল (স) বলেন, ‘বান্দা ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্য হলো নামায ত্যাগ করা।’ (মুসলিম)

রোযা বা সাওম

আরবী ‘সাওম’ শব্দের প্রতিশব্দ হলো রোযা। ‘সাওম’ একবচন ও বহুবচন ‘সিয়াম’ এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। শরীয়াতের পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকাকে ‘সাওম’ বা রোযা বলে।
বস্তুত, রোযা রাখার রীতি সর্বযুগেই প্রচলিত ছিল। প্রথম নবী হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স) পর্যন্ত সকল নবী-রাসূলই রোযা পালন করেছেন। আল্লামা ইবনে কাসীর (র) বলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিন দিন রোযা রাখার বিধান ছিল। পরে রমযানের রোযা ফরয হলে তা রহিত হয়ে যায়। (শামী, দ্বিতীয় খন্ড পৃ: ৯২)
হযরত মুসা (আ), হযরত ঈসা (আ) এবং তাদের অনুসারীগণ রোযা পালন করতেন। তবে তাদের সাথে আমাদের রোযার পার্থক্য বিদ্যমান। নবীগণের মধ্যে হযরত দাউদ (আ)-এর রোযা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি একদিন রোযা রাখতেন এবং একদিন বাদ দিতেন। (শামী ২য় খন্ড, পৃ: ৯৫)।

রোযার তাৎপর্য :
ইসলামের দৃষ্টিতে রোজা হলো এমন এক শারীরিক ইবাদত, যা রোযাদারকে সজীবতা, হৃদয়ের পবিত্রতা ও চিন্তাধারায় বিশুদ্ধতা প্রদান করে।
কুরআনের আয়াত (অনুবাদ)
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য রোযাকে ফরয করা হয়েছে যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে সক্ষম হও।’ (সূরা বাকারা ২ : ১৮৩)
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস (রমযান মাস) পাবে, তারা যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে।’ (সূরা বাকারা ২ : ১৮৫)।
হাদীস (অনুবাদ)
১।  রাসূল (স) বলেন : ‘‘প্রত্যেক মাসে তিন দিন এবং রমজান মাসে রোযা  পালন করা সমস্ত বসর রোযার সমতুল্য। আরাফাতের দিন (হাজী ছাড়া অন্যদের) রোযা  পালন করলে আমি এই আশা করি যে, আল্লাহ তাআলা তার পূর্বের বসরের গুনাহ আর পরের বসরের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। আর আশুরার (দশই মুহররম) দিনে রোযা পালন করলে আল্লাহ তাআলা তার পূর্বের বসরের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।’’ (মুসলিম)
২।  রাসূল (স) আরো বলেন : ‘‘যদি আমি আগামী বসর বেঁচে থাকি তবে মুহররমের নবম দিনেও রোযা পালন করব।’’ (মুসলিম)
৩।  রাসূল (স) ঈদুল ফিতরের ও ঈদুল আযহার দিনে রোযা পালন করতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)
৪।  আয়েশা (রা) বলেন : ‘‘রাসূল (স) রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে সমস্ত মাস ব্যাপী রোযা পালন করেননি।’’ (বুখারী ও মুসলিম)
৫।  ‘‘রাসূল (স) শা’বান মাস ব্যতীত অন্য কোনো মাসে এত অধিক সাওম সাধনা করতেন না।’’ (বুখারী)

রোযা ফরয হওয়ার শর্তাদি :
১. মুসলমান হওয়া,
২. জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া এবং
৩. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া।

রোযা আদায় ওয়াজিব হওয়ার শর্তাদি :
১. রোগমুক্ত হওয়া,
২. মুকীম থাকা,
৩. হায়েয অবস্থায় না থাকা এবং
৪. নেফায অবস্থায় না থাকা।
উপরিউক্ত অবস্থায় তাক্ষণিক রোযা ফরয হবে না তবে কাযা করতে হবে।

যাকাত

‘যাকাত’ আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায় যাকাত বলতে ধনীদের ধন-সম্পদে আল্লাহর নির্ধারিত অবশ্য দেয় অংশকে বোঝায়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সম্পদশালীদের সম্পদ থেকে নির্ধারিত ৮টি খাতে যাকাত বণ্টন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
বস্ত্তত, যাকাত হলো সম্পদশালীদের সম্পদে আল্লাহর নির্ধারিত সেই ফরয অংশ, যা সম্পদ ও আত্মার পবিত্রতা অর্জন, সম্পদের ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং সর্বোপরি আল্লাহর রহমত লাভের আশায় নির্ধারিত খাতে বণ্টন করার জন্য দেয়া হয়।
যাকাত ইসলামী জীবন-বিধানের অন্যতম একটি মৌল ভিত্তি ও অবশ্য পালনীয় ইবাদত। ঈমান, নামায ও রোযা সকল প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের ওপর ফরয, কিন্তু যাকাত ও হজ্ব শুধুমাত্র অর্থ-সম্পদের দিক দিয়ে সামর্থ্যবান মুসলমানদের ওপর ফরয।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘‘তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করুন। এর দ্বারা আপনি তাদের পবিত্র এবং পরিশোধিত করতে পারেন।’’ (সূরা তাওবা ৯ : ১০৩)
অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘‘তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা কর ও যাকাত দাও। তোমরা নিজের জন্য উত্তম কাজের যা কিছু পূর্বে প্রেরণ করবে আল্লাহর নিকট তা পাবে। তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ তার দ্রষ্টা।’’ (সূরা বাকারা ২ : ১১০)

যাকাত ব্যয়ের খাত:
সূরা তাওবার ৬০ নং আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা যাকাত ব্যয়ের ৮টি খাতের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। যথা :
১.  ফকির বা দরিদ্র : ফকির বলা হয় এমন ব্যক্তিকে যার সামান্য সম্পদ থাকে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
২.  মিসকীন বা নিস্ব : মিসকীন হলো এমন ব্যক্তি যার কোনো সম্পদ নেই, একেবারে নিস্ব।
৩. যাকাত উসূল ও বণ্টনের কর্মচারী : যারা যাকাত উসূল করার জন্য রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক নিয়োজিত আছেন তাদেরকে যাকাত প্রদান করা যাবে।
৪.  মন জয় করার উদ্দেশ্যে : এ ধরনের লোকদের মধ্যে নও মুসলিম অন্যতম। তাদের মন জয় করার জন্য যাকাত প্রদান করা যাবে।
৫.  দাসমুক্তির জন্য : কোনো ক্রীতদাসকে মুক্ত করার জন্য যাকাত দেয়া যাবে।
৬.  ঋণগ্রস্তদের জন্য : ঋণী ব্যক্তিকে তার ঋণ পরিশোধের জন্য যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে।
৭.  আল্লাহর রাস্তায় : আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধের জন্য মুজাহিদদের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য যাকাত প্রদান করা যাবে।
৮.  পথিক/মুসাফির : সফরে এসে কোনো মুসাফির নিস্ব হলে তাকেও যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে।
উপরোক্ত ৮টি খাতের বাইরে যাকাত দেয়া বৈধ হবে না। কেননা মহান আল্লাহ তাআলা কর্তৃক উপরিউক্ত ৮টি খাত নির্দিষ্ট।

যাকাত যোগ্য জিনিস ও তার নেছাব পরিমাণ
১।    ফসল ও ফল : এর নেছাব হল পাঁচ আওছাক বা ৬১২ কেজি (কিলোগ্রাম)। আর যদি সেচ ছাড়াই উৎপাদিত হয় তখন দশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে। আর সেচ দ্বারা উৎপন্নহলে বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে।
২।    নগদ টাকা বা সোনা, রূপা ইত্যাদির যাকাত :
ক)   সোনা : ২০ দিনার বা ৮৫ গ্রাম পরিমাণ ওজন হলে তাতে ৪০ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ শতকরা আড়াই ভাগ।
খ)   রূপা : উহা যখন ৫৯৫ গ্রাম হবে তখন শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত দিতে হবে।
গ)   নগদ টাকা : উহা সোনা বা রূপা যে কোনো একটার নেছাব সমান নগদ টাকা থাকলেই যাকাত দিতে হবে শতকরা আড়াই ভাগ।
৩।    ব্যবসার মাল : সোনা বা রূপার হিসাবে দাম হিসাব করে শতকরা আড়াই টাকা দিতে হবে।
৪।    গবাদী পশু :
ক)   উট : উহার সর্বনিম্ন পরিমাণ হল ৫টা। উহাতে যাকাত দিতে হবে ১টা ছাগল।
খ)   গরু : উহার সর্বনিম্ন নেছাব হল ৩০টা। উহাতে যাকাত দিতে হবে ১ বছরের একটি বাছুর।
গ)   ছাগল : উহার সর্বনিম্ন নেছাব হল ৪০টা। উহাতে যাকাত দিতে হবে ১টা ছাগল।
উল্লেখ্য, পশুর উপর তখনই যাকাত ওয়াজিব হবে যখন এগুলো পুরো বৎসর মাঠে চরে খাবে এবং এ সম্পর্কে আরো জানতে ফেকাহর কিতাব দেখা যেতে পারে।

যাকাত বিষয়ক কিছু হাদীস
১।  সম্পদের বৃদ্ধি, বরকত হওয়া, হেফাজত ও খারাবী থেকে বেঁচে থাকা সমস্তই ঘটে যাকাত আদায়ের কারণে। রাসূল (স) বলেছেন : ‘‘ছাদক্বাহ দেয়ার কারণে সম্পদ কমে না।’’ (মুসলিম)
     আবু হুরাইরাহ (রা) রাসূল (স) হতে বলেন : সম্পদের অধিকারী কোনো ব্যক্তি যদি যাকাত না দেয় তবে কিয়ামতের দিন ঐ সমস্ত জিনিসকে জাহান্নামের আগুনে গরম করে পাত বানান হবে, তারপর উহা দ্বারা তার পার্শ্ব, কপাল ও অন্যান্য অঙ্গে ছেক দেয়া চলতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ তাআলা বিচার শেষ করেন। আর ঐ দিন হবে পঞ্চাশ হাজার বৎসরের   সমান। তারপর তার নির্দিষ্ট স্থান হবে হয় জান্নাত না হয় জাহান্নাম। (মুসলিম, আহমদ)
২।  বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে, রাসূল (স) আরো বলেন : যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা সম্পদের অধিকারী করেছেন, তিনি যদি যাকাত আদায় না করেন তবে ঐ সম্পদকে এক শক্তিশালী টাক মাথা, দুই শিংওয়ালা রূপে উঠান হবে যা তাকে কিয়ামতের দিন আঘাত করতে থাকবে। তারপর তাকে দাঁত দিয়ে কামড়াবে ও বলবে- আমি তোমার মাল, আমি তোমার গুপ্ত সম্পদ।
৩।  মুআয ইবনে জাবাল (রা) কে যখন রাসূল (স) ইয়ামেনে পাঠান তখন তাকে যে উপদেশ দেন তার মধ্যে আছে : যদি তারা তোমার ঐ কথা মেনে নেয় তবে তাদের জানাবে, আল্লাহ তাদের উপর কিছু ছাদাক্বাহ ফরয করেছেন। তা ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং গরীবদের মধ্যে বিলি করা হবে। (বুখারী)
 

হজ্ব

‘হজ্ব’ আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ সংকল্প করা। হজ্ব ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির অন্যতম একটি ভিত্তি। এটি একটি আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত। যিলহাজ্ব মাসে নির্ধারিত দিনসমূহে নির্ধারিত পদ্ধতিতে বাইতুল্লাহ শরীফ ও সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহ যিয়ারত ও বিশেষ কার্যাদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় সম্পাদন করাকে হজ্ব বলা হয়।

হজ্বের ইতিহাস :
সর্বপ্রথম হযরত আদম (আ) বাইতুল্লাহ শরীফে হজ্ব আদায় করেন। এরপর হযরত নূহ (আ) সহ অন্যান্য নবী-রাসূলগণ বাইতুল্লাহ শরীফ যিয়ারত ও তাওয়াফ করেছেন। (আখবারে মক্কা : আবুল ওয়ালীদ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ)।
হজ্ব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘‘মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহে (বাইতুল্লাহ শরীফ) হজ্ব করা তার অবশ্য কর্তব্য।’’ (সূরা আলে ইমরান ৩ : ৯৭)

হজ্বের ফরযসমূহ
হজ্বের ফরয তিনটি। যথা:
১. হজ্বের নিয়তে ইহরাম বাঁধা।
২. কা‘বা ঘর তাওয়াফ করা।
৩. আরাফার ময়দানে ৯ই যিলহাজ্ব তারিখে উকূফ (অবস্থান) করা।

হজ্বের ওয়াজিবসমূহ
১.আরাফার ময়দান হতে প্রত্যাবর্তনের সময় মুযদালিফায় অবস্থান করা।
২.সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝখানে দৌড়ানো। দৌড়টা শুরু হবে সাফা থেকে এবং শেষ হবে মারওয়াতে।
৩.জামরাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপ করা।
৪.হারামের সীমার মধ্যে কুরবানীর দিনসমূহে মাথা মুন্ডানো বা চুল ছাঁটা।
৫.নিষিদ্ধ বিষয় যেমন- সেলাইযুক্ত কাপড় পরা, মাথা ও মুখ ঢাকা, শিকার মারা, স্ত্রী সহবাস, গালমন্দ ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকা।
৬.কুরবানীর দিনসমূহেই তাওয়াফে যিয়ারত করা।
৭.মক্কাবাসী ব্যতীত অন্যান্যদের জন্য তাওয়াফে সদর করা। আর একে তাওয়াফে বিদাও বলা হয়।
৮.প্রত্যেক তাওয়াফের পর দু’রাকাআত নামায পড়া।

হজ্বের সুন্নাতসমূহ
১.ইহরামের সময় গোসল বা অজু করা।
২.নতুন বা ধৌত করা সাদা লুঙ্গি ও চাদর পরা।
৩.ইহরামের নিয়ত করার পর দু’রাকাত নামায পড়া।
৪.বেশি করে তালবিয়াহ পড়া।
৫.মক্কার বাইরের অধিবাসীদের জন্য তাওয়াফে কুদুম করা।
৬.মক্কায় অবস্থানকালে বেশি করে তাওয়াফ করা।

হজ্বের নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ
১.স্ত্রী সঙ্গম ও সঙ্গম উদ্রেককারী কাজসমূহ।
২.কোনো নিষিদ্ধ কাজ করা।
৩.পরস্পর গালমন্দ ও বিবাদে লিপ্ত হওয়া।
৪.সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং নখ কাটা।
৫.পুরুষের জন্য সেলাইযুক্ত কাপড় যেমন- পাঞ্জাবী, পায়জামা, জুববা ও মোজা ইত্যাদি পরিধান করা।
৬.মহিলাদের মুখ ও হাত ঢেকে রাখা।
৭.মাথার চুল বা দাড়ি অথবা বগল ও নাভির নিচের লোম উপড়ে ফেলা।
৮.মাথা ও মুখ প্রচলিত কোনো পোশাক দিয়ে ঢাকা।
৯.চুল বা শরীরে তেল লাগানো।
১০.হারামের গাছ কাটা বা হারামের ঘাস উপড়ে ফেলা এবং স্থলের বন্যপশু হত্যা করা। আর তা হালাল হোক বা না হোক উভয়ই সমান।
(বেহেস্তি জেওর, নুরুল ইযাহ, আলফিকহুল মুয়াসসার)

হজ্ব বিষয়ক কিছু হাদীস (অনুবাদ)
১।     রাসূল (স) বলেন, ‘‘এক ওমরাহ হতে পরবর্তী আর এক ওমরাহ, এই দুই ওমরাহ পালন করা মধ্যবর্তী সময়ের কাফফারা (মুছে যাওয়া) স্বরূপ। আর কবুল হজ্বের বদলা একমাত্র জান্নাত’’। (বুখারী ও মুসলিম)
২।     রাসূল (স) আরো বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি এমনভাবে হজ্ব আদায় করল যাতে কোনো ফাহেশা কথা বা কাজ বা ফাসেক্বী কোনো কর্ম করল না, সে যেন তার পাপ হতে এমনভাবে পবিত্র হল যেন এই মাত্রই তার মা তাকে প্রসব করল।’’ (বুখারী ও মুসলিম)
৩।     কোনো মহিলার জন্য মাহরাম পুরুষ ব্যতীত একাকী হজ্বের সফর বা যে কোনো সফর করা হারাম। কারণ রাসূল (স) বলেন, ‘‘কোনো মহিলা কখনই কোনো মাহরাম পুরুষ ব্যতীত সফর করবে না।’’ (বুখারী ও মুসলিম)
৪।     বৎসরের যে কোনো সময় ওমরাহ করা জায়েয। তবে রমযানে করা উত্তম। কারণ রাসূল (স) বলেন, ‘‘রমযানে ওমরা করা হজ্বের সমতুল্য।’’ (বুখারী ও মুসলিম)
৫।     আর মসজিদুল হারামে নামায আদায় করলে অন্য যে কোনো মসজিদে নামায আদায় করা হতে একলক্ষ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। কারণ রাসূল (স) বলেন, ‘‘আমার এই মসজিদে (মসজিদে নববী) এক রাকাআত নামায আদায় করা মসজিদুল হারাম ব্যতীত অন্য যে কোনো মসজিদে হাজার রাকাআত আদায় করা হতে উত্তম।’’ (বুখারী ও মুসলিম)

সংক্ষেপে (চিত্রের মাধ্যমে) হজ্ব পালনের প্রক্রিয়া

দৈনন্দিন জীবনের কিছু আমল

কখন-কোথায়-কি বলবেন
মহান আল্লাহ তাআলা ইসলামকে তাঁর বান্দার জন্য করেছেন সহজ। মানুষের খাওয়া-দাওয়া, আচার-আচরণ, কথাবার্তা ইত্যাদি সব কিছুই ইবাদত হয়ে যায়, যদি তা সম্পাদিত হয় ইসলাম প্রদর্শিত কিছু রীতি-নীতির আলোকে। দৈনন্দিন জীবনে মানুষের সাথে কথাবার্তা ও মেলামেশায় বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি দু’আ বা আমল নিচে তুলে ধরা হলো:
>> বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
    যে কোনো ভালো কাজের শুরুতে বলতে হয়- বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম (অর্থ: পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি)।
>> আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম
    শয়তানের অনিষ্টতা থেকে আল্লাহর আশ্রয় লাভ এবং কুরআন মজীদ পড়ার সময় সর্বপ্রথমে বলতে হয়- আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম (অর্থ: আমি বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই)।
>> আসসালামু আলাইকুম
      কোনো মুসলমানের সাথে দেখা হলে বলতে হয়- আস সালামু আলাইকুম (অর্থ: আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)।
>> আললাহু আকবার
     সিঁড়ি বা কোথাও উপরে উঠার সময় বলতে হয়- আল্লাহু আকবার (অর্থ: আল্লাহ সবচেয়ে বড়)।
>> সুবহানাল্লাহ
     ভালো কোনো খবর বা কাজ হতে দেখলে অথবা স্বাভাবিক কোনো কাজের মধ্যে ব্যতিক্রম দেখলে এবং সিঁড়ি হতে নিচে নামার সময় বলতে হয়- সুবহানাল্লাহ (অর্থ: আল্লাহ পবিত্র ও সুমহান)।
>> মা-শা-আল্লাহ
    যে কোনো ভালো বিষয়ে এবং কোনো বস্ত্তর প্রতি কু-দৃষ্টির ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বলতে হয়- মা-শা-আল্লাহ (অর্থ: আল্লাহ যেমন চেয়েছেন)।
>> জাযাকাল্লাহু খায়রান
    কেউ আপনার কোনো উপকার করলে বলতে হয়- জাযাকাল্লাহু খায়রান (অর্থ: মহান আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন)।
>> ইনশাআল্লাহ
    ভবিষ্যতে হবে, করবে বা ঘটবে এমন কোনো বিষয়ে বলতে হয়- ইনশাআল্লাহ (অর্থ: মহান আল্লাহ যদি চান   তাহলে)। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ মুমিনদেরকে এর নির্দেশ দিয়েছেন।
>> আলহামদুলিল্লাহ
    যে কোনো সুখবর বা ভালো অবস্থা সম্পর্কিত সংবাদের ব্যাপারে বলতে হয়- আলহামদুলিল্লাহ (অর্থ: সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য)।
>> আলহামদুলিল্লাহ, ইয়ারহামুকাল্লাহ এবং ইয়াহদীকুমুল্লাহু ওয়া ইউছ্লিহু বালাকুম
     হাঁচি দিলে (হাঁচিদাতা) বলতে হয়- আলহামদুলিল্লাহ (অর্থ: সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য)।
    হাঁচিদাতার দোয়া শ্রবণকারীকে বলতে হয়- ইয়ারহামুকাল্লাহ (অর্থ: আল্লাহ তোমার উপর রহম করুন)।
    হাঁচি শ্রবণকারীর দোয়ার উত্তরে হাঁচি দাতাকে বলতে হয়- ইয়াহদীকুমুল্লাহু ওয়া ইউছলিছ বালাকুম (অর্থ : আল্লাহ তোমাকে হিদায়াত করুন এবং তোমার অবস্থা সঠিক রাখুন)। (বুখারী)
>> আস্তাগফিরুল্লাহ
    কোনো অন্যায় বা গুনাহ হয়ে গেলে বলতে হয়- আস্তাগফিরুল্লাহ  (অর্থ: আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই)।
>> নাউযুবিল্লাহ
    যে কোনো মন্দ ও গুনাহের কাজ দেখলে তার থেকে নিজেকে আত্মরক্ষার্থে বলতে হয়- নাউযুবিল্লাহ (অর্থ: আমরা মহান আল্লাহর কাছে এ থেকে আশ্রয় চাই)।
>> লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ
    শয়তানের কোনো ওয়াসওয়াসা বা দূরভিসন্ধিমূলক কোনো প্রতারণা থেকে বাঁচতে হলে বলতে হয়- লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ (অর্থ: মহান আল্লাহর আশ্রয় ও শক্তি ছাড়া আর কোনো আশ্রয় ও শক্তি নেই)।
>> ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি র-জিঊন
    কোনো দু:সংবাদ বা বিপদের সময় বলতে হয়-ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি র-জিউন (অর্থ: নিশ্চয়ই আমরা মহান আল্লাহর জন্য এবং আমরা তার দিকেই ফিরে যাবো)।
>> আল্লাহ হাফেয বা ফি আমানিল্লাহ
    কারো কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় বলতে হয়- আল্লাহ হাফেয (অর্থ: মহান আল্লাহ উত্তম হিফাজতকারী) অথবা ফি আমানিল্লাহ।

আরো কিছু প্রয়োজনীয় দু’আ

>> পেশাব-পায়খানায় প্রবেশের পূর্বের দু’আ
     উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিনাল খুবছি ওয়াল খাবায়িছ।
     অর্থ : হে আল্লাহ! সকল প্রকারের নোংরামী ও নোংরা বিষয়গুলো থেকে তোমার আশ্রয় চাই। (বুখারী ও মুসলিম)
>> পেশাব-পায়খানা থেকে বের হওয়ার পরের দু’আ
     উচ্চারণ : গুফরানাকা আলহামদুলিল্লাহিল্লাযী আযহাবা আন্নিল আযা ওয়া আফানী।
     অর্থ : হে আল্লাহ আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি, সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমার কষ্ট দূর করে দিয়ে আমাকে প্রশান্তি দিয়েছেন। (ইবনে মাজাহ ও নাসায়ী)
     উল্লেখ্য, পায়খানা থেকে বের হবার পর উপরের দোয়া মনে না থাকলে শুধু এটুকু পড়লেও চলবে। গুফরানাকা।
>> খাবার শুরু করার দু’আ
     উচ্চারণ : বিসমিল্লাহি ওআলা বারাকাতিল্লাহ।
     অর্থ : আল্লাহর নামে শুরু করছি এবং আল্লাহর বরকত কামনা করছি।
>> খাওয়া শেষে পড়ার দু’আ
     উচ্চারণ : আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আত্বআমানা ওয়া সাক্বানা ওয়া জ্বাআলানা মিনাল মুসলিমীন।
    অর্থ : সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাদেরকে খাওয়ালেন, পান করালেন এবং মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত করলেন। (তিরমিযী, আবু দাউদ)
>> নিদ্রা যাওয়ার সময় পড়ার দু’আ
     উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমূতু ওয়া আহইয়া।
     অর্থ : হে আল্লাহ! আমি তোমার নামে মরি ও জীবিত হই। (বুখারী)
>> পোশাক পরিধান করার দু’আ
     উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নী আস-আলুকা মিন খায়রিহী ওয়া খায়রা মা-হুয়া লাহু, ওয়া আউযুবিকা মিন শাররিহী ওয়া শাররি মা-হুয়া লাহু।
     অর্থ : হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট এর কল্যাণ কামনা করি, যা এতে রয়েছে এবং তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি এর অকল্যাণ থেকে, যা তাতে রয়েছে।
>> ঘর থেকে বের হওয়ার দু’আ
     উচ্চারণ : বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি লা-হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
     অর্থ : আল্লাহর নামে বের হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করলাম, আল্লাহ ব্যতীত আমার কোনো উপায় এবং শক্তি নেই। (আবু দাউদ)
>> মসজিদে প্রবেশ করার দু’আ
     উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাফতাহলী আবওয়াবা রহমাতিক।
     অর্থ : হে আল্লাহ! আমার জন্য তোমার রহমতের দরজা খুলে দাও। (মুসলিম)
>> মসজিদ থেকে বের হওয়ার দু’আ
     উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা মিন ফাদলিক।
     অর্থ : হে আল্লাহ! আমি তোমার অনুগ্রহ কামনা করছি। (মুসলিম)
>> কুরবানীর দু’আ
    উচ্চারণ : ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাতারস-সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানীফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন। ইন্না ছলাতী ওয়ানুসুকী ওয়া মাহয়ায়া ওয়ামামাতী লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। লা-শারীকা-লাহু ওয়াবিযালিকা উমিরতু ওয়া আনা আউয়ালুল মুসলিমীন, আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নী মিন ফুলান ইবনি ফুলানিন কামা তাকব্বালতা মিন হাবীবিকা মুহাম্মাদিন ওয়া খলীলিকা ইবরাহীমা আলাইহিমাছ ছালাতু ওয়াসাল্লাম।
 

কুরআন ও হাদিস বিষয়ক কিছু লিংক